বাঙালি মানেই ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। আমাদের তিন বেলার প্রধান খাবার ভাত। কিন্তু মাঠ থেকে কেটে আনা সোনালী ধান সরাসরি আমাদের পাতে ভাত হয়ে আসে না। এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ এবং চমৎকার প্রক্রিয়া, যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ধান ছাঁটাই বা হাসকিং (Husking)।
আজকের ব্লগে আমরা জানবো হাসকিং রাইস কী, এর বিভিন্ন পদ্ধতি এবং চালের পুষ্টিগুণে এর প্রভাব সম্পর্কে।
হাসকিং রাইস (Husking Rice) কী?
সহজ কথায়, ধান থেকে তার ওপরের শক্ত খোসা বা তুষ (Husk) ছাড়িয়ে ভেতরের চাল বের করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় হাসকিং বা ড্যাহাসকিং (Dehusking)। এই খোসা ছাড়ানোর পরেই আমরা রান্নার উপযোগী চাল বা পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্রাউন রাইস (Brown Rice) পেয়ে থাকি।
ধান ছাঁটাইয়ের বিবর্তন: অতীত থেকে বর্তমান
সময়ের সাথে সাথে ধান থেকে চাল বের করার প্রযুক্তিতে এসেছে বিশাল পরিবর্তন:
-
ঢেঁকি ও গাইল-ছিয়া (ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি): এক সময় গ্রামীণ বাংলার ঘরে ঘরে ঢেঁকির শব্দে ঘুম ভাঙতো। কাঠ দিয়ে তৈরি ঢেঁকিতে পা দিয়ে চাপ দিয়ে বা বড় কাঠের গাইলে মুষল দিয়ে আঘাত করে ধানের খোসা ছাড়ানো হতো। এই পদ্ধতিতে চালের পুষ্টিগুণ শতভাগ ঠিক থাকতো, তবে এতে পরিশ্রম এবং সময় দুটোই লাগতো অনেক বেশি।
-
লোকাল হাসকিং মিল (Huller Mills): গ্রামগঞ্জে বা মফস্বলে এখনো এই মিলগুলো বেশ জনপ্রিয়। এখানে মূলত মেকানিক্যাল হালার (Huller) মেশিনের মাধ্যমে ধানের খোসা ছাড়ানো এবং পালিশ করার কাজ একসাথে করা হয়।
-
আধুনিক অটো রাইস মিল (Modern Automated Mills): বর্তমান যুগে চালের সিংহভাগ চাহিদাই পূরণ করে আধুনিক অটো মিলগুলো। এখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাবার রোলারের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধানের খোসা আলাদা করা হয়, যার ফলে চাল ভেঙে যাওয়ার হার অনেক কমে যায়।
হাসকিং-এর প্রকারভেদ এবং চালের পুষ্টিগুণ
ধান কীভাবে ছাঁটাই করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে চালের পুষ্টিগুণ কেমন হবে:
-
ব্রাউন রাইস (Brown Rice): হাসকিং মেশিনে যখন ধানের শুধু ওপরের শক্ত খোসাটি (Husk) ফেলে দেওয়া হয় কিন্তু ভেতরের পুষ্টিকর লালচে আবরণ (Bran) রেখে দেওয়া হয়, তাকে ব্রাউন রাইস বা লাল চাল বলে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ থাকে।
-
হোয়াইট রাইস (White Rice): হাসকিং করার পর চালটিকে যখন আরও বেশি ছাঁটাই এবং পালিশ (Polishing) করা হয়, তখন ব্রান বা কুঁড়ার স্তরটি সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে চকচকে সাদা চাল বের হয়। এটি দেখতে সুন্দর এবং রাঁধতে সহজ হলেও, অতিরিক্ত ছাঁটাইয়ের কারণে এর ভিটামিন বি এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণ অনেকটাই কমে যায়।
চাল উৎপাদনে হাসকিং-এর উপজাত (By-products)
হাসকিং প্রক্রিয়া থেকে শুধু চালই পাওয়া যায় না, বরং আরও কিছু মূল্যবান উপাদান পাওয়া যায় যা বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়:
-
তুষ (Rice Husk): এটি মিলের বয়লার জ্বালানি হিসেবে, পোল্ট্রি ফার্মের লিটার হিসেবে এবং জৈব সার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
-
কুঁড়া (Rice Bran): চালের পুষ্টিকর এই আবরণ থেকে বর্তমানে উচ্চ গুণসম্পন্ন ‘রাইস ব্র্যান অয়েল’ (ভোজ্য তেল) তৈরি হচ্ছে। এছাড়া এটি গবাদি পশু ও মাছের উৎকৃষ্ট খাদ্য।
শেষ কথা
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আমরা খুব সহজেই ঝকঝকে ও পরিষ্কার চাল পাচ্ছি। তবে চালের পুষ্টিগুণ বজায় রাখতে অতিরিক্ত ছাঁটাই বা পালিশ না করা চাল খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো। ঢেঁকি ছাঁটা চাল বা হালকা হাসকিং করা চালের ভাত আমাদের শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
আপনি আপনার দৈনন্দিন খাবারে কোন ধরনের চাল পছন্দ করেন? ব্রাউন রাইস নাকি রেগুলার হোয়াইট রাইস? কমেন্ট করে আমাদের জানান!



